Showing posts with label লেখকের গল্প. Show all posts
Showing posts with label লেখকের গল্প. Show all posts

তক্ষক (লেখকঃ হাসান মোরশেদ)

4 Comments

১। আইপডটা কানে গুঁজে দেবো কিনা ভাবছি। নিতান্ত অভদ্রতা হয়ে যায়, কিন্তু কোনো বিকল্প খুঁজে পাচ্ছিনা। বয়স্ক ভদ্রলোক একটানা কথা বলে যাচ্ছেন। কথা বলা শুরু করেছেন অন্ততঃঘন্টা খানেক। আমি কিছুটা বিস্মিত ও হচ্ছি বটে। এই শীর্নশরীরের প্রায় বৃদ্ধ মানুষটা এতো কথা বলার শক্তি পাচ্ছেন কি করে?

যাচ্ছি ট্রেনে। এক জেলা শহরে চাকরীর ইন্টারভিউ দিতে। সুন্দর রোদেলা দিন। ট্রেনে ভীড় কম। জানালার পাশে বসেছি। পাশের সীট খালি ছিলো। চমৎকার বাতাস। আইপডে লোপামুদ্রার গান। উপভোগ করছিলাম।

প্রতীতির কথা মনে পড়ছিলো। পড়শু ডেটিং হলো আসিফের ফ্ল্যাটে। মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। গল্প এখন শেষ পর্যায়ে। আমাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই,ছিলো ও না কোনোদিন। তবু হয়তো আমার মনে পড়বে প্রতীতিকে, প্রতীতির ও আমাকে মনে পড়বে কোনো অবসরে।
প্রতিবার ডেটিংয়েই প্রতীতি আমাকে শরীর দেয় আর দেয় এক একটা চমৎকার কবিতার বই। ও মেয়ে নিজে কবিতা টবিতা পড়েনা কিন্তু আমাকে পড়ায়। সম্পর্ক হওয়ার আগে কোন একদিন বোধ করি ওকে জানিয়েছিলাম আমি, কবিতায় আমার প্রেমের কথা। আমার অনেক কিছুতেই পরে ও আর বিশ্বাস রাখেনি, কিন্তু এই অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারটা মনে গেঁথে রেখেছে।

ব্যাগ খুলে কবিতার বইটা বের করি। জয় গোস্বামীর কবিতা সংগ্রহ। আমি জয়ের কবিতার তেমন ভক্ত নেই। বড্ড বেশী লিরিক্যাল। তবু এই ছুটেচলা রোদেলা দুপুর, প্রায় নির্জন রেলের কামরা, হুহু বাতাস- আমি প্রতীতির প্রতি প্রেম ও কবিতার প্রতি কামবোধে আক্রান্ত হই।

আইপড খুলে গলায় ঝুলিয়ে রাখি। বিশ্রাম নাও লোপামুদ্রা। ইতঃস্তত পাতা উল্টাই। বিন্যস্ত অক্ষর ও ছন্দের সমাবেশ। একটা পাতায় চোখ আটকায়ঃ

'একফোঁটা রক্ত শুধু ঝরে পড়ল,মাটি ফেটে গেলো আঘাতে? শিশুদের মরামুখ ভেসে উঠল কি একবার? তা কেউ দেখেনি,বড় মেঘ করে এসেছিল। নইলে দেখা যেত এই ফাঁকা
খেয়াঘাটে চাঁদ চেপে ধরে আছে রক্তে ভেসে যাওয়া নাড়ী তার।'

কেমন যেনো লাইনগুলো ।অকারনে আমার গা কেঁপে উঠে।

২। 'দেখলেন ঘটনা। এইবার কিন্তু খেলা জমবো। সব চোর ধরা পড়তেছে'

ভদ্রলোক আবার কথা শুরু করেছেন। তার কোলের উপর কটকটে হলুদ রংয়ের খবরের কাগজ। এই আরেক আপদ শুরু হয়েছে আজকাল। ত্রানের টিন,রিলিফের কম্বল,ঘুষের টাকা,তেরশো নদী,ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল গিলে খেয়ে ধরা পড়ছে বন কর্মকর্তা,পুলিশের দ্বিতীয়কর্তা,রানীমাতার জৈষ্ঠ্য সন্তান। আর এইসব নিয়ে সিনেমা সিনেমা গল্প জুড়ে দেয়া চায়ের টেবিল থেকে ট্রেনের কামরা পর্যন্ত। বিরক্ত লাগে। যন্ত্রনাময় দিনকাল।

-'আল্লাহর রহমত ছিলো, তাই দেশটা বেঁচে গেলো। আগামী ২০ বছর সেনাবাহিনীর ক্ষমতায় থাকা দরকার,কি বলেন?'

আমি মনে মনে গালি দেই। 'মর্ষকামী ভোদাই পাবলিক'। এই সব পাবলিকের কারনেই হাঁটুতে ঘিলুওয়ালারা ছড়ি ঘোরায়। যখন তখন রাস্তায় কানধরে উঠবস করাবে তবু পাবলিকের প্রীতি দূর হয়না। মুখে কিছু বলিনা। খামোখা কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আর দিনকাল আসলেই খুব সুবিধার না।

ট্রেনের গতি কমে আসছে। প্লাটফর্মে ঢুকতে আর খুব দেরী নেই। ভদ্রলোক কোমর উঠানো শুরু করেছেন। এবার তার ব্যাগ গোছানো শুরু করবেন নিশ্চিত। ট্রেন থামার আগেই দরজায় গিয়ে ভীড় জমাবেন, সেটা ও নিশ্চিত প্রায়। মনে মনে আরেক প্রস্ত গালি দেই।
-'তা বাবাজী এসে গেলাম প্রায়। অনেক কথা বললাম । কিছু মনে করেননি তো। আমারো একটা ছেলে আছে । আপনার বয়সীই হবে। না , আপনার চেয়ে আরেকটু বড়ো'
অর্থহীন কথা। আমি আতংকিত হই। নতুন কোন গল্প শুরু হয় বোঝি।
-'তবে আমার ছেলেটা আপনার মতো নয়'
-আমার মতো নয়, মানে?

নিজের অজান্তেই এই প্রথম আমি তার কথার জবাব দেই।
-আমার ছেলেটা পংগু। একটা মাত্র ছেলেই আমার সর্বনাশ। লোকটা এখন পংগু ছেলের গল্প ফেঁদে সাহায্য না চাইলেই হয়। পোষাক আষাকে ভদ্রলোক যদি ও। বিশ্বাস কি? যা দিনকাল পড়েছে। আমার আর কথা না বাড়ানোই নিরাপদ।

তবু কি আশ্চর্য! আমিই পালটা প্রশ্ন করি। আমার কন্ঠ কি কিছুটা আর্দ্র?
-দুঃখিত। কি হয়েছিলো ওনার? কোন অসুখ,কোন দুর্ঘটনা?
-দুর্ঘটনা? হ্যাঁ। তা দুর্ঘটনা ও বলতে পারেন কি এক অদ্ভুত কারনে আমার খুব আগ্রহ হচ্ছে এই বৃদ্ধের পংগু ছেলেটার কথা জানতে।
-বলুন না প্লিজ? কি হয়েছিলো?
-১৯৯০। মনে আছে বাবাজী? বয়স কতো তখন? ১০/১২? আমার ছেলেটা তখন ১৮। কলেজে পড়ে। আন্দোলন করে। আর্মি পিটিয়ে ওর কোমরের হাড় আর দুপা ভেংগে দিয়েছিলো। বুট দিয়ে থেঁতলে দিয়েছিলো ওর পুরুষাংগ'

আমি বেদনার্ত হই। অন্ততঃ হওয়া উচি। একজন বাবার মুখ ঝুলে পড়েছে তার একমাত্র পুত্রের পংগুত্বের গল্প বলতে গিয়ে।

কিন্তু আমি বেদনার্ত হইনা। এই বকবকে বুড়ো একটু আগেই বলছিলেন এই দেশে যেনো আরো ২০ বছর সেনা শাসন থাকে। এই বুড়োকে আমি মনে মনে গালি দিয়েছিলাম 'মর্ষ্কামী ভোদাই' বলে। আমার এবার তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে গালি দিতে ইচ্ছে করে।
-আমি দুঃখিত। কিন্তু আপনিই আগে বললেন অন্ততঃ আরো ২০ বছর সেনাশাসন দরকার। অথচ আপনার ছেলে ওদের হাতেই। আসলে আপনাদের মতো মানুষদের জন্যই...'

ট্রেন প্লাটফর্মে ঢুকছে এবার। গতি প্রায় থেমে এসেছে। বৃদ্ধ তার ব্যাগ গুছিয়ে হাঁটা শুরু করে দিয়েছিলেন। ফিরলেন। ফিরে এলেন আমার কাছে। আমার চোখে চোখ রাখলেন। কেমন ঘোলাটে। গা শিউরে উঠে। গলা নামালেন। হিসসিস করে বললেন-

২০ নয়, ২০০ বছর ধরে আমি আর্মির শাসন চাই। প্রত্যেক মা-বাবার একটা করে ছেলে গুলী খেয়ে মরুক নয়তো পংগু হয়ে পড়ে থাক বিছানায়, আমার ছেলের মতো।

বাইরে চমৎকার রোদ। তবু কেনো জানি সহসা তীব্র শীতের কাঁপুনি আমার সমস্ত জুড়ে। গন্তব্য পৌঁছে গেছি। উঠা দরকার। উঠতে পারছিনা। পারছিই না আর।

Read More

নতুন খাতার পাতায় (লেখকঃ আনোয়ার সাদাত শিমুল)

Be the first to comment!

ওমেন্স ওয়ার্ল্ডের সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে মনে হয় অনেক কাল পেরিয়ে যাচ্ছে। ধাপগুলো শেষ হচ্ছে না, বেড়ে যাচ্ছে প্রতি মুহুর্তে। অল্প সময়টুকুয় ভাবনার অনেকগুলো ঢেউ এসে তোলপাড় করে দিচ্ছে। মনের ধারাপাত আর সিঁড়ির ধাপ এ দু'য়ের মাঝামাঝি নো ম্যানস ল্যান্ডে আসতেই মনে হয় পা ফসকে পড়ে যাবে। তড়িৎ নিজেকে সামলে নেয় লোমেলা, রেলিং ধরে সাবধানে পা ফেলে। এমন হচ্ছে কেনো? গত রাতে মেইলটা পাওয়ার পর এ ভাবনা জেঁকে বসেছে মাথার ভেতর। আজ সকাল থেকে একটানা ভ্রু-প্লাগ, হেয়ার হারবাল, প্যাডিকিউর-ম্যানিকিউরে এতোটা সময় কেটে গেলো, একটুর জন্যও মন বসেনি। পার্লারের নাক বোঁচা মেয়েটি যতবারই কিছু জিজ্ঞেস করেছে, লোমেলা হু-হ্যাঁ করে গেছে। হিসাব নিকাশটা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে কেবল, থিতু হতে পারছে না - খানিকটা এক্সসাইটমেন্টও ঘিরে রেখেছে। সিঁড়ির শেষ ধাপে পা দিয়ে আবার পেছনে তাকায় লোমেলা। কতোগুলো ধাপ? মাথায় যে সংখ্যাটা কাঠঠোকরার মতো ঠুকিয়ে চলেছে ততবার সিঁড়ি ওঠানামা কি সম্ভব? কতক্ষণ লাগবে! কিংবা কতো দিন লাগবে? জিরো পয়েন্ট টু সিক্স নাইন মিলিয়ন!

দুই
দুপুরের পর থেকে আকাশের মুখ গোমড়া। অনেকক্ষণ ঝিম মেরে আছে চারপাশ। গুলশান লেকের শরীর শীর্ণ হয়ে আসছে ক্রমাগত। বছর তিনেক আগে লোমেলারা যখন নতুন ফ্ল্যাটে ওঠে তখনও খানিকটা নীল ছিল পানি। কচুরিপানা আছে সেরকমই, তবে পানির রং গেছে পাল্টে। আবার মনে হয় - মেঘলা আকাশের কারণে হয়তো পানি কালো মনে হচ্ছে! সেদিন জাহেদ ভাই বলছিলো - বাংলার আকাশ আর বাংলার মেয়ের মতিগতি বোঝা দায়। এই রোদের ঝিলিক, এই বৃষ্টি কখনো বা দো-মনা ভাব। লোমেলার মনে হচ্ছে - জাহিদ ভাই ইদানিং দো-মনা ব্যাপারটিকে ইনিয়ে বিনিয়ে টেনে আনছে বারবার। হয়তো সিদ্ধান্ত চাচ্ছে দ্রুত। পরিচয়টা খুব বেশী দিনের নয়, ফোরামে রিসেন্ট কার্টুন ডিবেট ডিসকাশন থ্রেডে মন্তব্য - প্রতিমন্তব্য। পরের মান্থলি মিটিংয়ে আলাপ এবং জানাশোনা। জাহিদ ভাই এ-লেভেল শেষে কিছুদিন ইস্ট ওয়েস্ট বিবিএ-তে ছিল। পরে ক্রেডিট ট্রান্সফার করে ব্রিসটল, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে এমবিএ। দেশে ফিরে ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে কাজ করছে। সিক্স ফিগারের স্যালারি, নোকিয়া পিডিএ ভর্তি শিডিউল - শহুরে হান্টার তরুণীরা এমন সুদর্শন ঈর্ষণীয় ইয়াংকে খুঁজে চলে দিনরাত। তবে জাহিদ ভাই অন্য রকম। মার্জিত ব্যবহার - মৃদূভাষী - ভীষণ ব্যক্তিত্বময় আচরণ। সব মিলিয়ে কালো ফ্রেমের চৌকোণা চশমা কিংবা চশমার ভেতরের চোখগুলো ইদানিং লোমেলাকে কাতর করছে খুব।

সেদিন ইফতার পার্টি শেষে ইমান্যুয়েলের সামনে জাহিদ ভাই নিচুস্বরে বলেছিলো - বাল বিখারকি, টুঁটি কবরোপে যাব কোই মাহযাবিন রোনতি হায়, মুঝে অফসর খিয়াল আতে হ্যায়, মোউত কিতনি হাসিন হ্যায়। শুনে লোমেলার মনে হয়েছিলো এই ইমান্যুয়েল, এই স্ট্রীট লাইট - সব নিভে যাক, থেমে যাক সব নি:শ্বাস, পাশাপাশি কেবল জাহিদ ভাই আর লোমেলা! এরকম উলুথালু ভাবনায় লাজুক সংকোচ ভর করে। সংকোচ থেকে মন ফেরাতেই এক বড়সড় নি:শ্বাস ফেলে লোমেলা। এ নি:শ্বাসে যতোটা না জাহিদ ভাইকে নিয়ে দমবন্ধ ভাবনা, তারচে' বেশী দো'মনা মনকে স্থির করে সিদ্ধান্ত নেবার সংকট। ততক্ষণে বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে। বৃষ্টি নামেনি, হয়তো লোমেলার মতো আকাশও দ্বিধান্বিত। ব্যালকনি থেকে উঠে ড্যাডির স্টাডি রূমে যায় লোমেলা। দ্বিতীয় খোপের খালি জায়গায় একটা অদৃশ্য বই জায়গা করে নেয়। কল্পনা করতে ভালো লাগে - লোমেলার লেখা বই। কো-অথর হিসেবে জাহিদ ভাইয়ের নাম আছে কিনা সেটা স্পষ্ট নয়। তবে আলোড়ন তোলা বই। জিরো পয়েন্ট টু সিক্স নাইন মিলিয়ন - ফ্যাক্ট অর পলিটিক্স?

তিন
গতকাল চাঁদ দেখার অপেক্ষা ছিল। আজ অপেক্ষা কিংবা আগ্রহ কোনোটাই নেই। আগামীকাল ঈদ। সন্ধ্যার পর গাড়ী নিয়ে বের হয় লোমেলা। 'লিবাস'এ জামাটা কেনা না কেনা নিয়ে সংশয় ছিল। লোমেলা চেয়েছিল স্ট্রেইট নেক, কালারও আরেকটু লাইট হলে ভালো হতো। লিবাস থেকে সামিরার বাসা ওয়াকিং ডিসট্যান্স। জামা কিনে সামিরার বাসায় আড্ডা হয়। টিভি চ্যানেলগুলোয় ঈদের গান চলছে - রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। বাস্কিন-রবিন্সের আইসক্রীম ছিলো ফ্রিজে। খেতে খেতে আলাপ জমে ইতস্তত, বিক্ষিপ্ত। লোমেলা টিভির চ্যানেল পাল্টায়। ইন্ডিয়ান চ্যানেলগুলোও এবার ঈদের উপর হাইলাইট করছে। জিটিভিতে নভরাত্রি-ঈদ নিয়ে বিশেষ আয়োজন, মাস জুড়ে সানডে নাইট স্পেশালে শাহরুখ খান। হঠাৎ লোমেলার মনে পড়ে আজ হিরো হোন্ডা সারেগামাপা গ্র্যান্ড ফিনালে। ঘন্টা কয়েক পরেই শুরু হবে, আদিত্য নারায়ণ হোস্ট হিসাবে দূর্দান্ত! লোমেলার ফেভারিট আমানত আলী, আর সামিরার প্রিয় রাজা হাসান। রেডিফে লোমেলা অনলাইন ভোট দিয়েছে। সামিরার এমপিথ্রি প্লেয়ারে তখন রাজা হাসানের হাস্কি ভয়েস - আল্লাহ কি বন্দে হাসতে - - -। তারপর অনিক ধর নিয়ে আলাপ হয়। সনু নিগমের কপিক্যাট কোলকাতার ছেলে অনিক সারেগামাপা বাংলার চ্যাম্পিয়ন, হিন্দিতেও চ্যাম্পিয়ন হলে পাবলিক ওপিনিয়ন কেমন হবে সেটা নিয়ে তর্ক জমে। হিমেশ রেশমিয়ার নাটুকেপনা নিয়েও হাসাহাসি হয়। লোমেলা চ্যানেল পাল্টায় বারবার। ফোরামে লোমেলা মিডিয়া অবজারভার; বাংলা-হিন্দি-উর্দূ- ইংরেজী চ্যানেলে নিয়মিত চোখ রাখতে হয়। অনগোয়িং কনসেন্ট্রেশন আর্টিকেল স্যাটেলাইটে ডেইলি সোপ। সাত ফেরের সালুনি, সারথীর মানসেন, দুলহানের ভেদিয়া-সিন্দুরা, মায়িকার মাহী অথবা কসম সে'র বাণী ওয়ালিয়ার নিত্য জীবন নিয়ে নোট রাখছে লোমেলা। সাথে পিটিভি-হোমের স্ত্রী নিয়ে চমৎকার কমপারিটিভ অ্যানালাইসিস হবে। সোশ্যাল ট্রান্সফরমেশনের এলিমেন্ট হিসেবে আর্টকেলটা প্রয়োজনে এক্সটেন্ড করা যাবে। তবে আপাতত: ফোরামে ঝড় উঠবে নিশ্চিত! আচমকা স্টার ওয়ার্ল্ডে চুম্বক দৃশ্য শুরু হলে সামিরা লোমেলাকে খামচি মেরে বসে - 'তুই একটা পুরা শয়তানের নানী দাদী'।

সামিরার বাসা থেকে ফেরার পথে গাড়ীতে এফএম এইটি নাইন পয়েন্ট সিক্স; রেডিও টুডে। সংবাদ শিরোনামে - 'কাঁচপুরে চল্লিশ বাসযাত্রীর সর্বস্ব লুট'। চল্লিশ জনের মাল লুট করতে কয় জন ডাকাত লাগে? কতক্ষণ লাগে? সলিটেয়ারে হিডেন কার্ডগুলো উন্মোচন করলে বাকী খেলা যেমন টপাটপ মিলে যায় তেমন করে চল্লিশ জনের হিসাব করতে গিয়ে সকালের সংখ্যাটা আবার ফিরে আসে। কিভাবে আগানো যায়, কোথায় আরো ম্যাটারিয়াল পাওয়া যায় সেসব ভাবতে ভাবতে লোমেলা বাসায় পৌঁছে। টু হান্ডরেড অ্যান্ড সিক্সটি নাইন থাউজেন্ড!

চার
ঈদের এসএমএস পাঠানো শুরু হয়ে গেছে। লোমেলার মোবাইলে বেশ কিছু গ্রিটিংস আসলো ঘনঘন। শেষটা দেখে মেজাজ চড়ে যায়, আসিফের এসএমএস। মানারাতে ভালো বন্ধু ছিল আসিফ । এরপর, আরো বেশি কিছু। লোমেলা তখন নিজেকে জেফরি আর্চারের হুইমি হিরোইন এবং আসিফকে দেয়াল বেয়ে পনেরো তলায় ওঠা ইস্পাত হিরো ছাড়া কিছু ভাবতে পারেনি। নাইনথ গ্রেডের ফাইনাল শেষে লোমেলার বার্থ ডে ছিল সেদিন। গার্লস নাইট আউটে লোমেলা নিজেকে কিশোরীর বদলে রমণী ভাবতে চেয়েছিলো অদ্ভুত সন্ধ্যায়। পরে আসিফের বাটারফ্লাই আচরণে লোমেলা দূরে সরেছিল, কেবল সরেনি সন্ধ্যার ভুল ভালোবাসা, ভুল স্মৃতি। মাঝে মাঝে মনে হয় স্মৃতিকোষে ছুরি চালিয়ে ঐ অংশটুকু ফেলে দিলে ভালো হতো। পারা যায় না। আজ যেমন আসিফের এসএমএস অনুতাপ জাগিয়ে দেয় মনে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে লোমেলা রিপ্লাই করে - "টোল্ড য়্যূ থাউজেন্ড টাইমস, এগেইন - প্লিজ নেভার কন্টাক্ট মী। আই হেইট য়্যূ - বিচ।"

এক অসহনীয় যন্ত্রণায় লোমেলার কান্না পায়। জিটিভিতে ততক্ষণে বিজেতা ঘোষিত হচ্ছে, আমানত আলী থার্ড। কষ্টটা আরো জাঁকিয়ে বসে। এমন সময় জাহিদ ভাইয়ের ফোন -
- কি করো?
- কিছু না।
- ঈদ মোবারক।
- আপনাকেও।
- আগামীকাল প্ল্যান কি?
লোমেলা এই ফাঁকে টিস্যুতে চোখ মোছে - 'কোনো প্ল্যান নেই'।
- লেট'স গো সামহয়্যার!
লোমেলা চুপচাপ।
- 'আর য়্যূ অলরাইট?' জাহিদ ভাইয়ের উদ্বিগ্ন প্রশ্ন।
- না আমি ঠিক আছি। আপনি কি এখন ফ্রি?
- হ্যাঁ, বলো।
- আপনি আর্টিকেলটা পেলেন কোথায়?
- গত রাতে যেটা মেইল করলাম?
- হুমম
- দেখোনি? ইকনোমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি। তিন সপ্তাহ আগের ইস্যু।
- আই অ্যাম ইমপ্রেসড! দারুণ অ্যানালাইসিস। আমি ভাবছি - এটা নিয়ে খানিকটা পড়াশোনা করি। ফোরামে দেবো নাকি?
- ট্রান্সলেট করে দিও না। নিজের মতো করে গুছাও। সময় নিয়ে লিখো।
- ওকে। এটা নিয়ে কি আংকেলরা কেউ কাজ করেছেন?
- তেমন হয়নি। তিরিশ লক্ষের হিসাব নিয়ে কিছু লেখালেখি আছে। আব্বাও বলছিলেন - ইন্টারন্যাশনালি লেখা হয়নি।
- ওকে। ড্যাডি আমাকে বলছিলেন, শেখ মুজিব তিন লক্ষকে ভুলে থ্রি মিলিয়ন বলেছিল।
- আরো লজিক আছে। 'লিগ্যাসি অব ব্লাড' পড়েছো?
- শেলভে আছে দেখেছি, পড়িনি।
- তালুকদার স্যারের কিছু সংকলনও আছে পলিটিক্যাল সায়েন্স নিয়ে, ওগুলো ইংলিশে সার্কুলেট করা দরকার।
- তালুকদার স্যার মানে, ঐ যে প্রফেসর আংকেল?
- হ্যাঁ। এফএম এর লেখা ফলো করো?
- এফএম কে?
- তুমি তো মনে হচ্ছে ডেইলি সোপে ডুবে আছো ইদানিং। পেপার পড়ো না?
- ওহ, বুঝেছি - মাজহার সাহেব?
- হ্যাঁ।
লোমেলা হাসে এবার। কোনো কারণ নেই, অথবা খানিকটা অপ্রত্যাশিত ভালো লাগা।
- 'পোস্ট ঈদ গেট টুগেদার কোথায়?' জাহিদ ভাই প্রশ্ন করে।
- এবার চলেন বাঁশরীতে যাই। ওদের সেট মেন্যুটা দারুণ।
- ওকে।
- আচ্ছা, উইকিপিয়ায় দেখলাম - সুজান ব্রাউনমিলারের সুত্র মতে দুই লক্ষ থেকে চার লক্ষের মতো রেপড।
জাহিদ ভাই হেসে উড়িয়ে দেয় - 'ওটা সম্ভবত: এগেনস্ট আওয়ার উইল বই থেকে নেয়া।
- মে বি।
- হা হা। জানোই তো ইতিহাস লেখা হয় বিজয়ীর কলমে।
- আপনার হেল্প লাগবে এবার। আমি সিরিয়াসলি ব্যাপারটা নিয়ে কাজ করতে যাই।
- টেক য়্যূর টাইম, ম্যাম!
- ম্যাম?
জাহিদ ভাই এবার অন্যস্বরে কথা বলে - 'হোয়াট অ্যাবাউট টুমরো'স ইভিনিং'?
- 'হোয়াট?' লোমেলার জিজ্ঞাসায় উৎসাহের চেয়ে আবেদন বেশী।
- ওনলি য়্যূ অ্যান্ড মি । নো ওয়ান ইন দ্য ওয়ার্ল্ড! সাম ক্যান্ডেল লাইটস উইল ফিল শাই।
লোমেলা চুপচাপ। পাঁচ দশ সেকেন্ড মুহুর্ত কাটে নীরবে।
- মে আই গেট সাম টাইম?
- ইফ আই সে, নো?
লোমেলার মনে হয় গলাটা কেউ যেন চেপে ধরেছে। সে কথা বলতে পারছে না। চোখ মুখ ঝাপসা লাগছে। আরো একটু সময় নিয়ে ফিসফিস বলে - "হাউ মেনি আওয়ার্স লেফট ফর দ্যাট ইভিনিং?"
জাহিদ ভাই উচ্ছ্বাস লুকোতে পারে না - "আই ন্যূ বেবী- ইউ উইল বি মাই গার্ল"।

পাঁচ
দুই লক্ষ ঊনসত্তর হাজারকে দু'শ ছেষট্টি দিয়ে ভাগ করলে প্রতিদিন এক হাজারের মতো রেপড! লোমেলার অবাক লাগে তিন যুগেও কেউ সংখ্যাটা নিয়ে সংশয় করলো না! কম্পিউটারের স্ক্রিনে অনেকক্ষণ তাকিয়ে আছে সে। পিডিএফ ফাইলে শিরোনাম - "লুজিং দ্য ভিকটিমস - - - রিকাউন্টিং বাংলাদেশ ওয়ার"। একাত্তরের গন্ডগোলকে রিকাউন্ট করা হচ্ছে বিভিন্নভাবে। ফোরামে অনেক রিসোর্স জমা পড়েছে। জাহিদ ভাইয়ের ইফোর্ট খুব ইফেকটিভ হবে এবার! আট পৃষ্ঠার লেখাটা পড়তে পড়তে মুগ্ধতা জাগে বারবার। অনেকদিন এরকম সরল বিশ্লেষণের লেখা চোখে পড়েনি। প্রতি প্যারা পড়তে পড়তে লোমেলার মনে হচ্ছে বাংলা করলে আরো ডিটেইল আনা যাবে। লোমেলার ভাষার গাঁথুনি নিয়ে সবাই অ্যাপ্রিশিয়েট করে।

সারা দিনের চাপটা কমতে শুরু করেছে। ত্রিশ লক্ষের মিথ নিয়ে কাজ হয়েছে অনেক। সময়ের সাথে সাথে মানুষের আবেগ কমেছে, অ্যলায়েন্স হয়েছে বারবার। দুই লক্ষ ঊনসত্তর হাজার নিপীড়নের অযৌক্তিকতা উঠে আসবে এবার। লোমেলা সিরিয়াসলি লেখা শুরু করে, প্রথম লাইন - ফিকশন ক্যান নট সাবস্টিটিট দ্য ফ্যাক্ট। আর এগুতে পারে না। মনে হয় আরো পড়তে হবে। তারপরেই ফ্যাব্রিকেশন হবে। লোমেলার চোখে আবারও নিজের লেখা বইয়ের স্বপ্নটা জেগে ওঠে - "জিরো পয়েন্ট টু সিক্স নাইন মিলিয়ন - ফ্যাক্ট অর পলিটিক্স?" লোমেলারা প্রমাণ করে দেবে ওটা নির্ঘাৎ পলিটিক্স। হয়তো সময় লাগবে খানিক। একাত্তরকে রি-কাউন্ট, রি-ডিফাইন করে ইতিহাসের পাতাগুলো নতুনভাবে জ্বলজ্বল করবে। আপাতত: জি-মেইলে কম্পোজ ক্লিক করে লোমেলা - "ডিয়ার মিস শর্মীলা বোস - - -"।

Read More

পুরনো জমাট বাঁধা রোজনামচা (লেখকঃ এস এম মাহবুব মুর্শেদ)

Be the first to comment!

দো'তলা বাসের উপর তলার একদম সামনের সীটটা পেয়েছি আজকে। আমাদের প্রিয় সীট। এখানে বসলেই কেমন যেন মনে হয় টুরিস্ট বাসে করে শহর দেখতে বের হয়েছি। বেশ একটা মজার অনুভূতি। যাক, ভালই হল!

বাসটা যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। অবশ্য যাবারই কথা। লাস্ট স্টপ সেই হাউগাং। আমাদেরই নেমে পড়ার কথা ছিল বুগিস এর কাছে কোথাও। কিন্তু নামা হল না। এখন বাসের এরকম অবিরাম চলতে থাকা নিয়ে ভাবনাটাই অবান্তর। ইদানীং সবকিছুতেই বেশ একটা ফিলোসফিকাল ভাব চলে আসে। তাই মনে হয় এমন মনে হল।

'কি রে, কি ভাবছিস?' - তোর হঠাৎ প্রশ্নে ঘোর কাটল।

'বাসটা কেমন চলছে তো চলছেই, দেখলি?' - আমি বেশ একটা ভাব নিয়ে বলি।

'বাস তো চলবেই! আর একনাগাড়ে কই চলল? মাঝে-মাঝেই তো থামছে আর রোবটের মত মানুষ উঠছে-নামছে। তুই ঠিক আছিস?'

'কি জানি!'

তুই আর কথা বাড়ালি না। আমার ঠিক থাকার ঠিক কথা না। হাতে সময় কমে আসছে খুব দ্রুত। ঠিক থাকলে বুগিস ছাড়িয়ে এখন ল্যাভেন্ডার ক্রস করে এতদূর চলে আসতাম না হয়তো কোন কারণ ছাড়া। যেখানে নামার কথা ছিল, সেখানে বাসের বেল বাজানোর আগে আগে হয় তো বলে বসতাম না, 'চল না আজকে হাউগাং পর্যন্ত চলে যাই!' তুই-ও কি ঠিক আছিস? মনে হচ্ছে না। ঠিক থাকলে তখনই বাসের বেল বাজিয়ে দিতি। আমরা তাহলে আর এখন হাউগাঙের পথে থাকতাম না। হয়তো এতক্ষণে বুগিসের রাস্তায় হেঁটে বেড়াতাম বা উঠে যেতাম অন্য কোন অচেনা বাসে।

হাতে সময় কমে আসতে থাকলেই বোধ হয় এরকম পাগলামী মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে হুট করে। আমার এক বন্ধুর একটা লাইন মনে পড়ে গেল - 'পাগলামী, ঘুরে ফিরে'।

যা হোক, গল্প করার এমন সুযোগ হাতছাড়া করার কোন মানে হয় না। সেটা আমার 'বকরবাজ' স্বভাববিরুদ্ধ। রেপুটেশান বলে কথা! আমার তাই পুরনো-নতুন নানান গল্প মনে পড়ে যেতে থাকে, মুখ নিশপিশ করতে থাকে, যেন এগুলো এই বাসযাত্রায় না শেয়ার করলেই না! তাছাড়া হাতে সময়ও খুব কম। আবার কবে দেখা হয়!

'জানিস, এক দিন কি হয়েছে? আমরা পুরনো বন্ধুরা সব আড্ডা দিচ্ছি, হঠাৎ আমার ইয়া লম্বা পাগলাটে বন্ধু তূর্য এসে কখন যে পিছন থেকে আমার মাথায় সিগারেটের ছাই ফেলে চলে গেছে, আমি টেরই পাইনি! আশে-পাশের সবার হাসি শুনে পরে টের পেলাম। এই রকম বাটু হওয়াই বিপদ! কি একটা বেইজ্জতি, বল!'

'হুমমম...এইটা এর আগেও একবার বলেছিস।' - তোর গলায় স্পষ্ট বিরক্তি আর হাল ছেড়ে দেবার সুর।

'মাত্র একবার শুনেছিস? গুড। তাহলে আরো কয়েকবার বলা যাবে এখনো।' - আমার উৎসাহে কোন ভাটা পড়ে না।

তোর একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ পেলাম। কিন্তু সেটায় বিচলিত হবার প্রশ্নই আসেনা। না শোনার ভান করে আবার নতুন উদ্যমে শুরু করলাম।

'জানিস, আরেকবার কি হয়েছিল? ক্যান্টিনের সামনে বসে আছি আমি আর আমার দুই পুরনো বন্ধু। তিনজনে বসে খুব আয়েশ করে চটপটি খাচ্ছিলাম। আহা! শহীদ ভাইয়ের হাত ছিল মাশ'আল্লাহ একখান! ঢাকার বেস্ট চটপটি বানাতেন। তো সেদিন কি হল শোন -'

'আচ্ছা, তোর সেই বন্ধুগুলো তখনো কি 'পুরনো' ছিল?' - আমাকে মাঝপথে থামিয়ে হঠাৎ তোর প্রশ্ন।

মুহূর্তের জন্য মনে হল বাসটা যেন দুলে উঠল। আমি কি বলব বুঝতে পারলাম না। খুব কম সময়ই আমার মত কোন চ্যাটারবক্স বাকরুদ্ধ হয়ে যায় এমনভাবে। আজকে দিনটাই কেমন যেন। সবকিছুতেই অন্য রকম একটা ভাবের ভাব।

'না, ছিল না। তখন ওরাই শুধু বন্ধু ছিল। ওদের ঘিরেই ছিল গোটা দুনিয়া।' - একটু সময় নিয়ে উত্তর দিলাম।

'এই এখন যেমন আমরা বন্ধু? আমাদের নিয়েই আমাদের পৃথিবী? এরকম ছিল?' - তুই হঠাৎ কেমন যেন ক্ষ্যাপাটে হয়ে গেলি।

এর উত্তর আমি কী দেব? হুট করে তুই কেন এসব বাজে বকা শুরু করলি? কী লাভ? কিন্তু আজকে দিনটাই পাগলাটে আর সময়টাও বিটকেলে ভাবে তাড়াতাড়ি করে কই যেন চলে যাচ্ছে। এরকম সময়ে এরকমই হয় হয়তো।

'আচ্ছা, তুই এই যে সারাদিন তোর পুরনো বন্ধুদের গল্প করিস, ক'দিন পরে আমাকে নিয়েও এমন গল্প করবি, না? তোর অন্য কোন 'নতুন' বন্ধুর কাছে? তখন আমিও তোর 'পুরনো' বন্ধু হয়ে যাব, না?'

বাসটা চলতেই থাকে। মাঝখানে শুধু হঠাৎ হঠাৎ করে কারো কারো নেমে যাবার প্রয়োজন পড়ে। বেল বেজে ওঠে, সাথে স্ক্রীনে লেখা ওঠে 'BUS STOPPING'। আমাদের পাশ কাটিয়ে কেউ কেউ নেমে চলে যায় তাদের গন্তব্যে। আবার দূর থেকে হাত বাড়িয়ে থাকা কেউ কেউ তড়িঘড়ি বাসে উঠে পড়ে আমাদের পাশ কাটিয়েই বসে পড়ে কোথাও বা দাঁড়িয়ে যায়, যেমন আমরাও করি প্রতিদিন। কিন্তু আজকের দিনটা অন্যরকম। আজ সময় নেই একদম। আরো একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষায়। তাই সময়টাকে ধরে রাখার যাবতীয় চেষ্টা চলতে থাকে ক্রমাগত। হঠাৎ করেই বুকের জমাট বাঁধা উথাল-পাথাল কষ্ট বের হয়ে আসতে চায়। আর সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসে। তবে হাউগাং এখনো অনেক দূর।

Read More

মিনু (লেখকঃ শিমুল শিকদার)

1 Comment

প্রথম যেদিন মিনুকে দেখতে আসল, সেদিন মিনুর সে কী আনন্দ! লাজুক লাজুক খুশিতে সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখল। লজ্জা গোপন করতে সবার সাথে ধমকে ধমকে কথা বলতে লাগলো। পাত্রের নাম জাকির হোসেন। মিনু বলল, এ্যা, এটা একটা নাম হল? এ তো ঠেলাগাড়িওয়ালাদের নাম। মিনুর ছোট বোন অনু বলল, এই আপু বিয়ের পর তোর জাকির হোসেনকে কিন্তু আমি ফকির হোসেন নামে ডাকব। মিনু খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। মিনুর ভাল লাগে। কল্পনায় রাজপুত্র জাকির হোসেনের ছবি আঁকে। সুশ্রী, সুঠাম, বলিষ্ঠ যুবক- পঙ্খিরাজ ঘোড়া নিয়ে তার দোরে অপেক্ষায় থাকবে রাজকন্যাকে উড়িয়ে নেওয়ার জন্য। 
ছেলের মা মিনুকে উঠালো, বসালো, হাঁটালো, কতো যে কী শুনালো, বলালো, বুঝালো! 
কোন এক ফাঁকে মিনু জাকির হোসেনের দিকে আড় চোখে তাকালো। মিনুর বুক ধ্বক করে উঠলো। কল্পনার সাথে এতো অমিল! তাতে কী। তবুও সে যে তার রাজপুত্র।
জাকির হোসেনের মেয়ে পছন্দ হল। মিনুর প্রানে আনন্দের বন্যা বয়ে গেলো। সে রাতে সে সত্যি সত্যি স্বপ্নে দেখে ফেলল, জাকির হোসেন পঙ্কিরাজ ঘোড়া নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। ঘুম ভেঙ্গে মিনু জাকির হোসেনের উদ্দেশ্যে লম্বা এক চিঠি লিখে ফেলল, তার জীবনের জমানো সমস্ত ভালবাসার না বলা কথা দিয়ে।
কিন্তু বিয়েটা ভেঙ্গে গেলো। দরাদরিতে পোষালো না। 
এর কিছুদিন পর আবার মিনুকে দেখতে এলো। ছেলে কিন্তু এবারে সত্যি সত্যি রাজপুত্র। যেমন উঁচালম্বা, তেমন গায়ের রঙ। ভাল চাকরি করে। নাম আসাফউদ্দলা খান। আসাফউদ্দলা খানকে মিনুর ভারী পছন্দ হলো। সে রাতেও মিনু আসাফউদ্দলা খানকে স্বপ্ন দেখল। 
বিয়ে কিন্তু সেটাও ভেঙ্গে গেলো। মেয়ে পছন্দ হল না। 
এর পরের বারও মিনুর খুব ভাল একটা সম্বন্দ এলো। পাত্রের সরকারী চাকরি, দেখতে ভাল, বংশ ভাল। কিন্তু তারা পছন্দ করে ফেলল মিনুর ছোট বোন অনুকে। এতো ভাল পাত্র মিনুর মা হাতছাড়া করতে নারাজ। অনুর সাথেই বিয়েটা হয়ে গেল। 
এরপর অনেকদিন চলে যায়। মিনুর আজকাল আর বিয়ের সম্বন্ধ আসে না। চুলে পাঁক ধরেছে, চোখের নিচে কালি পড়েছে। মিনু কিন্তু এখনো স্বপ্ন দেখে দিগন্ত থেকে ছুটে আসা এক পঙ্খিরাজ ঘোড়া তার দোর গোঁড়ায় দাড়িয়ে। শুধু রাজপুত্রের চেহারাটা ঝাপসা ঝাপসা।

Read More

মনিহার (লেখকঃ শিমুল শিকদার)

1 Comment

বাবার বদলির চাকরী। আমরা এ জেলা সে জেলা করে বেড়াই। কোথাও বেশী দিন থাকা হয় না। আমি যখন স্কুলের শেষের দিকে তখন বাবা বদলি হয়ে পটুয়াখালীতে এলেন। আমরা কিছুদিনের জন্য সেখানে স্থির হলাম। তখন স্কুলে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল মনু। ভাল নাম মানোয়ার হোসেন। গোবেচারা ধরনের ফর্শা ছেলেটি। স্বভাবে খুবই স্বল্পভাষী। মনুর সাথে বন্ধুত্বের একটা ঘটনা আছে। মনু তখন শ্রেণীর সেরা ছাত্র। ক্লাসে ফার্স্টছাড়া কখনো সেকেন্ড হয় নাই। আমি যেবার ওই স্কুলে ভর্তি হলাম, তার পরের বছরইকিভাবে যেন সেকেন্ড হয়ে গেলো। স্কুলে হৈ চৈ পড়ে যায়। স্কুলের প্রধানশিক্ষক আমাকে তাঁর কক্ষে ডেকে পাঠালেন। অনেকটা মোরগ-লড়াই দেখার মনোভাব নিয়ে আমার পিঠ চাপড়ালেন মনুকে হারিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করার জন্য। শিক্ষকরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলেন। আমি যেসব শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়তাম তাঁরা বলতেলাগলেন, তোমারএইপ্রথমস্থানধরেরাখতেহবে।পারবেতো? আমি সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ালাম। মনুর পক্ষের শিক্ষকরা বলতে লাগলেন, ওই ছেলেটাকে তোর হারানো চাই। শুনেছি ছেলেটা ভাল, কিন্তু গ্রামারে নাকি কাঁচা।হাতেরলেখাওনাকিভালনা। তুই একটু চেষ্টা করলে কিছুতেই তোর সাথে পারবে না। 
স্কুলে যখন ভর্তি হই, তখন আমারজানা ছিলনা মনু আসলে কী জিনিষ। আস্তে আস্তে বুজতে পারি, মনুচেষ্টা করলে আসলেইওর সাথে আমি পারতাম না। কিন্তু সে চেষ্টা মনু করেনি, আর কোনদিনই করেনি। ওর মতো অসাধারণ মেধাবী আর একটা ছেলে আমার সামনে কখনো পরেনি। দরিদ্র পরিবারের সন্তান মনু। আমার তুলনায় ওর সুযোগ সুবিধাও কম। ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষার কয়েকদিন আগের কথা। প্রচণ্ড এক ঝড়ে ওদের ঘর পড়ে যায়। খবর শুনে দেখতে গিয়ে যা দেখলাম, তাতে চমকে উঠলাম। ওর বইখাতার পৃষ্ঠাগুলো নর্দমায় ভাসছে।মনু তুলে তুলে শুকাতে দিচ্ছে। মনে মনে ভাবলাম ওর বৃত্তি পরীক্ষা এখানেই শেষ। এ ক্ষেত্রে আমার অবস্থা অন্তত তাই হতো। বৃত্তি পরীক্ষার রেজাল্ট যেদিন বের হলো সেদিন শুধু অবাকই হইনি, ওর প্রতি আমার প্রচণ্ড আগ্রহও তৈরি হল। মনু শুধু ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিই পায়নি, পুরো বিভাগের মধ্যে প্রথম হয়েছিলো। 
ক্লাস নাইনে মনুকে হারিয়ে আমি প্রথম হলাম। সারা স্কুলে আমার জয়জয়কার। কিন্তু আমার সাফল্যের রহস্যটা সবার অজানা রইলো। সে সময় মনু পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করেছে। তখনতাঁর জীবনে যোগ হয়েছে নুতন দুটি বিষয়, নারী ও কবিতা। যে মেয়ের প্রেমে পড়েছিলো, তাকে নিয়ে কবিতা লিখতে শুরু করলো। কীঅসাধারণইনা ছিলসেসব কবিতাগুলো! আমার এখনো কিছু কিছু লাইন মনে পড়ে-
“ভালবাসার বাজারে গিয়েছিলাম, ভালবাসা খরিদ করবো বলে।
কতো ধরনের যে ভালোবাসা আছে, আগে জানা ছিল না। 
দামি ভালোবাসা, নামী ভালোবাসা, 
ছলনার ভালোবাসা, প্রতারনার ভালোবাসা,
সস্তা ভালোবাসা, নষ্ট ভালোবাসা,
অনেক ঘুরে ঘুরে খালি হাতেই ফিরে এলাম।
ভালবাসা কেনার কোন সামর্থ্যই যে আমার নেই। 
ফেরার পথে দেখি পথের ধারে পড়ে আছে 
মোড়কে মোড়ান কার যেন ফেলে যাওয়া ভালোবাসা।
কুড়িয়ে পাওয়া সে ভালোবাসা 
বুকের ভেতর যত্ন করে রেখে দিলাম। 
ভালবাসার সে মোড়ক খুলি না অজানা এক ভয়ে। 
খুলে যদি দেখি কারো অপবিত্র সে ভালোবাসা।
সে ভালবাসায় এখন আমার দিন কাটে, রাত কাটে। 
ভালোবাসা ছাড়া বাঁচি কী করে!”
সেসব কবিতা পড়ে ওই মেয়ের কী অনুভূতি হতো আমি জানি না, কিন্তু আমি মনুর ভক্ত হয়ে গেলাম। ওর মতো অসাধারণ মেধাবী, প্রতিভাবান, নিরহঙ্কারী বন্ধু পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। 
মনুর সাথে আমার বন্ধুত্বটা স্কুলের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ রইলো না। আস্তে আস্তে শহরের সীমানা ছাড়িয়ে গেলো। সুযোগ পেলেই দুজনে দুটো সাইকেল নিয়ে শহর ছেড়ে কোথায় যে হারিয়ে যেতাম!মনুর কোনও সাইকেল ছিল না।বাবার অফিস থেকে ওর জন্য একটা সাইকেল আনিয়ে রাখতাম। ওর বেশীরভাগ সময়ই কাটত আমাদের বাসায়। ওদের বাসায় কখনো যাওয়া হতো না। একবার আমাকে দাওয়াত করে নিয়ে গেলো। মনুর মা নানা রকমের পিঠা-পায়েস দিয়ে আমাকে আপ্যয়ন করলো। মিষ্টিভাষী মহিলার আতিথেয়তা আমার হৃদয় স্পর্শ করলো। সেদিন এর বাহিরে আর একজন আমার হৃদয় স্পর্শ করলো। মনুর বোন। অসাধারণ তার রূপ। হালকা পাতলা গড়ন, টানা টানা চোখ, খাড়া নাক, গোলাপি বর্ণ, এক মাথা কোঁকড়ানো চুল। মনে হল শিল্পীর তুলির আঁচড়ে আঁকা কোন প্রতিমা। আমার অন্তরের সমস্ত তন্ত্রীগুলো যেন মুগ্ধ হয়ে একসাথেউচ্চারণ করলো, অসাধারণ! অসাধারণ!! আর একবার মুগ্ধ হয়ে গেলে কোন প্রকার চালাকি চলে না।সকল যুক্তিই অগ্রাহ্য হয়ে যায়। আবেগের ঘোড়া তখন চার পা তুলে লাফাতে থাকে। আমি মনুর বোন অনুর প্রেমে পড়ে গেলাম।
এরপর নানান ছুতোয় মনুদের বাসায় আমার যাওয়া-আসা বেড়ে গেলো। বিভিন্ন ছলাকলা করে তাকে আমার ভাল লাগা বুঝানোর চেষ্টা করতে লাগলাম।সে অসম্ভব বুদ্ধিমতী হাওয়া সত্ত্বেও আদৌ কিছু বুজতো বলে মনে হচ্ছিলো না। বরং আমি মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম তার ব্যক্তিত্ব, গাম্ভীর্য, বুদ্ধিমত্তা দেখে। ধীরে ধীরে মনে হল আমি তলিয়ে যাচ্ছিঅনুর প্রেমের অতল গভীরে। আর অপেক্ষা করতে পারছিলাম না। একদিন আড়ালে পেয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে মনের কথাটাবোঝানোর চেষ্টা করলাম। কী বুজল, কিছুই বুজলাম না। আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গেলো।এরপর থেকে আচার ব্যবহারে, ভাবে ভঙ্গিতে আমাকে বুঝিয়ে দিলো আমাকে সে গ্রাহ্যের মধ্যেই আনছে না। আমার ব্যপারে একেবারে নির্বিকার। আমার আত্মসন্মানেএকটু আঘাত লাগলো।
এরপর দেখা হলে কদাচিৎ কথা হতো অনুর সাথে। কিন্তু ওর কথার উদ্দেশ্য থাকতো একটাই, আমাকে হেয় করা। একদিন বলল- ভাইয়ার ক্লাসে আপনিই বুঝি ফার্স্ট বয়? 
যা সত্য তাই বললাম, হ্যাঁ।
-ভাইয়া তো লেখাপড়া ছেড়ে প্রেম করে বেড়াচ্ছে। তাই ফার্স্ট হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। 
কথা সত্য। কিন্তু এভাবে বলার দরকার ছিল না। 
-তুমি চাও না আমি ফার্স্ট হই? 
-বিষয়টা আমার চাওয়া না চাওয়ার নয়, বিষয়টা যোগ্যতা নিয়ে। যোগ্য স্থানে যোগ্যকেই মানায়। 
-আমি কী এতই অযোগ্য? 
-আপনি অযোগ্য একথা কে বলল? প্রশ্নটা হচ্ছে ফার্স্ট হাওয়ার জন্য আসলে কতটা যোগ্য? 
অনুযুক্তিদিয়েকথাবলে।ওরসাথেকথায়পেরেওঠাকঠিন।আমিচুপচাপশুনেযেতাম।এভাবেচলতেথাকল।
স্কুল শেষ করে কলেজে পা রাখলাম। মোটা মোটা বই। দু’বছরে শেষ করতে হবে। মনে হল নদী থেকে সাগরে এসে পড়েছি। ব্যস্ততা বেড়ে গেলো। ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময়েমনুর প্রেমে টানা পোড়ন চলছিল। তাই ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। কলেজে উঠে ও নানা রকম সভা সমিতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে। কিন্ত আমার সাথে ওর যোগাযোগে ছেদ হল না। অনুই হয়তো এর মূল কারণ ছিল। আমি যে ওর উত্তরেরঅপেক্ষায় আছি। মনের মাঝে ভালবাসার যে বীজ বপন করেছিলাম, সময়ের সাথে সাথে তা কখন যে বৃক্ষে পরিণত হয়েছে, নিজেও টের পাইনি। বয়সের সাথে সাথে অনুর যৌবনের মাদকতা ও বাড়তে লাগলো। এখন আর চোখ ফেরানো যায় না। আমারও সদা জাগ্রত যৌবন। দেখতে দেখতে ভালবাসার সে বৃক্ষ ফুলে ফলে ভরে গেলো। আমার বিশ্বাস ছিল,বয়েসের সাথে সাথেঅনু নিশ্চয়ই একদিনআমার এ ভালবাসার মূল্য বুঝবে আর আমারও অপেক্ষার দিন শেষ হবে। কিন্তু অবস্থা পরিবর্তনের কোন লক্ষণ দেখা গেলো না। প্রথম প্রেমে পড়লাম। শয়নে স্বপনে যাকে ধারন করি, সে তো ভাল করে কথাই বলে না। বরং আচার আচরণে, ভাব ভঙ্গিতে আমার প্রতি তার অবজ্ঞার পরিমাণ যেন দিনে দিনে বাড়তে লাগলো। এ কেমন প্রেম? 
দেখতে দেখতে কলেজ শেষ হয়ে গেলো। ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। এদিকেবাবাও ঢাকাতে বদলি হয়েছে। আমাদের পটুয়াখালীর পাট চুকাবার পালা। অনুর সাথে সরাসরি কথা বলার সাহস সঞ্চয় করলাম। আড়ালে পেয়ে মনের কথাগুলোবলার জন্য আমতা আমতা করছিলাম। ও হেসে বলল, কথাও তো গুছিয়ে বলতে পারেন না। আমি আরো অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। আর কিছু বলা হল না। ‘না’ শব্দটা বলা তো খুব সহজ। অনু কিন্তু আমাকে ‘না’ বলছে না। আমার বিশ্বাস, ও আমার ভালবাসার পরীক্ষা নিচ্ছে, আমি ও পরিক্ষা দিয়ে যাচ্ছি।পটুয়াখালী ছাড়ার আগের দিন ওকে দেখার জন্য, ওর সাথে একটু কথা বলার জন্য মন অস্থির করতে লাগলো। শেষবিকেলে এক কাণ্ড করে বসলাম।মা’র গহনার বাক্স থেকে মা’র বিয়ের মনিহার পকেটে পুরে সোজা হাজির হলাম ওদের বাসায়। কোত্থেকে এতো সাহস পেলাম নিজেও জানি না। ভাগ্যিস মনু বাসায় ছিল না। চলে যাচ্ছি শুনে মনুর মা মন খারাপ করলো। তিনি ভিতরে গেলেন আপ্যয়নের ব্যবস্থাকরতে। একা পেয়ে মনিহারটা ওর হাতে তুলে দিয়ে বললাম, এই হারটা আমার দাদীর শাশুড়ি দাদীকে দিয়েছিলেন, দাদী দিয়েছিলেন আমার মাকে, আমার মা রেখে দিয়েছেন তার একমাত্র পুত্রবধুর জন্য। আজ থেকে এ মনিহার তোমার।অনু আমাকে হেয় করার শেষ সুযোগটা যেন ছাড়ল না। মণিহারটা টেবিলে উপর ছুঁড়ে ফেলে বলল, হুহ! আয়নায় নিজের চেহারা দেখেছেন কখনো?আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। অনু আমাকে এভাবে আক্রমণ করবে এটা অন্তত কল্পনা করিনি। আমি কালো, দেখতে সুন্দর না। কিন্তু এ নিয়ে আমার নিজের খুব একটা খেদ কোন কালেই ছিল না। আজ প্রথমবারের মতো নিজের চেহারা নিয়ে আমি অসহায় বোধ করতে লাগলাম।কোনও উত্তর খুঁজে পেলাম না। আর কি-ই বা বলবো? চুপ করে বেরিয়ে এলাম। 
সেদিন ঘোরের মধ্যে নদীর পাড় দিয়ে একা একাকতদূর, কতক্ষণ হেঁটেছিলাম তা আর মনে পড়ছে না। আমার প্রথম প্রেমের জন্ম হল, ধীরে ধীরে তা পরিণত হল, তারপর হটাৎ একদিন আমাকে ছেড়ে কোথায় যেন চলে গেলো।আমার মনের ভিতরে দুইটা সত্ত্বা তৈরি হল। একটা সত্ত্বা আমার পক্ষে, অপরটা অনুর পক্ষে তর্ক শুরু করলো। অনুর পক্ষেরটা বলল, ওর মতো রূপ আর কার আছে? তার তো অহংকার থাকবেই। ওই অহংকারই ওর অলঙ্কার। এই অহংকার কেবল ওরই মানায়।কতটা সাধনা করেছিস যে ওর মতো রূপসীর মনের নাগাল পাবি? আমার পক্ষের সত্ত্বা বলছে, স্বীকার করি সে সুন্দর। আর শুধু সৌন্দর্যই কী সব কিছু? তাছাড়া তুই-ই বা কম কিসে?গায়ের রং কালো, এই কী সব? তোর মতো ভালো ওকে আর কে বাসবে? 
রাতে বাসায় ফিরে দেখি হুলুস্থুল অবস্থা।পুলিশের সামনেবাসার সব কাজের লোকদের জড় করা হয়েছে। মনিহার চুরির দায়ে তাদের জেরা চলছে। মা তাঁর সন্দেহের তীর একে একে সবার দিকেই ছুড়ল, শুধু আমি ছাড়া। এক পর্যায়ে মা বাবাকেও সন্দেহ করা শুরু করলো। বাবার জুয়া খেলার অভ্যাস ছিল। 
পরের দিনখুব সকালে আমরা পটুয়াখালী ছাড়লাম। বুকের ভিতর থেকে কী যেন ছিঁড়ে গেলো। কী যেন পেছনে রেখে গেলাম। 
বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়গুলো অনেকটা নিরসভাবেকাটতে লাগলো। মনু ভর্তি হল আর্ট কলেজে। মুখ ভর্তি দাড়ি গোঁফ নিয়ে মাঝে মাঝে আমার হোস্টেলে হাজির হয়। চুপ চাপ কিছুক্ষণ বসে থাকে, এক কাপ চা খায়, আবার চলে যায়। অনুর বিষয়ে আমি কখনো কিছু জিজ্ঞেস করি না। ওকে ভুলতে পারি না, আবার মনে রাখতেও কষ্ট হয়। ওকে পাওয়ার আশা আর করি না।
এরমধ্যে মনুর বাবা মারা গিয়েছে, মনু মাদকাসক্ত হয়েছে,আমার জানা মতে অনুর এখনো বিয়ে হয় নাই। মনু ছাড়া সংসারে উপার্জনক্ষম আর কেউ নেই। সংসার কিভাবে চলছে কে জানে। কখনো জিজ্ঞেস করা হয় না। 
বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ হাওয়ার আগেই জাপানে মনবুশ স্কলারশিপ পেয়ে গেলাম। মা তাড়াহুড়ো করে আমার বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে লাগলেন। বিয়ে না দিয়ে তিনি কিছুতেই বিদেশে যেতে দিবেন না। কিছুদিনের মধ্যে একটা পাত্রী জোগারও করে ফেললেন। দেখতে সুন্দর, শিক্ষিত, ভালো বংশ, ভালো পরিবারের মেয়ে। সরকারের কোন এক মন্ত্রীর আপন ভাতিজি। ঢাকার এক রেস্টুরেন্টে আনুষ্ঠানিক ভাবে পাত্রীর সাথে আমার পরিচয় হল। পাত্রীর নাম ফারজানা চৌধুরী বর্না। স্বভাবে মার্জিত, ভদ্র, মৃদুভাষিণী, মৃদুহাসিনী। খুব মনোযোগ দিয়ে সব কথা শোনে। ভেবে চিন্তে যুক্তি দিয়ে উত্তর দেয়। সে উত্তরে ভুল হাওয়ার সুযোগ কম।ফারজানা চৌধুরী বর্নাকেআমার ভালো লেগে গেলো। আমরা এখন রাত জেগে ফোনে কথা বলি, এক সাথে বাহিরে ঘুরি, নামীদামী রেস্টুরেন্টে ডিনার করি। ঘুমানোর সময় চোখ বুঝে বুঝে ফারজানা চৌধুরী বর্নার কথা ভাবি। ভাবতে ভালো লাগে। 
হটাৎ একদিন লক্ষ্য করলাম, আমার মনের ভিতর অনুর আর কোন স্থান নেই। সে স্থান পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে ফারজানা চৌধুরী বর্না। পৃথিবীতে মানুষের মনের চেয়ে বিচিত্র আর কিছু নাই। যে অনুর জন্য একসময় বাঁচতে-মরতে ইচ্ছে হতো তা এখন পুরোপুরি অতীত। 
এদিকে আমাদের বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হল। উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়ামা’র সেই হারিয়ে যাওয়া মনিহারের শোক কিন্তু মা এখনো ভুলতে পারেননি। ভুলবেই বা কী করে? এ মনিহার যে তিনি আগলে রেখেছিলেন তাঁরপুত্রবধুর জন্য। নিজের বিয়ের পুরনো ছবি দেখেসেই মনিহারের মতো হুবহু আর এক সেট বানাতে দিলেন। খানদান বলে কথা।
বিয়ে বাড়িতে আত্মীয়স্বজন গিজগিজ করছে। এরকম হট্টগোলের ভিতর হঠাৎ মনু এসে হাজির। ওর মুখে যা শুনলামতাতে আমার মাথায় বাজ পড়লো। 
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অনু হাসপাতালে শয্যাশায়ী। আমাকে দেখতে চাচ্ছে।বলতে বলতে মনুহুহু করে কেঁদে উঠলো। ছুটে গেলাম হাসপাতালে। বিছানায় শোয়া অনুকে দেখে চমকে উঠলাম। মনে হচ্ছে একটা কঙ্কাল বিছানার সাথে লেগে আছে।তার সেই অনিন্দ্য সুন্দর মুখটা কালো বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে। মাথার প্রায় সব চুল পড়ে গেছে।আমাকে দেখে অনুর পাশে বসা ওর মা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। কিন্তু অনুর কোনও ভাবান্তর হল না। ওকে খুব স্বাভাবিক মনে হল। ও উঠে বসার চেষ্টা করলো। মনু আর ওর মা ধরাধরি করে আধশোয়া ভাবে বসিয়ে দুজনেই বাহিরে চলে গেলো,সম্ভবত আমাদের দুজনকে একান্তে কথা বলার সুযোগ করে দিতে। এতক্ষণ অনু অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল। এবার আস্তে আস্তে বালিশের নিচ থেকে যা বের করে আমার হাতে দিলো তা দেখে আমি চমকে উঠলাম। অনুর কাছে রেখে আসা আমার মায়ের সেই মনিহার। আমি নির্বাক হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। বললাম,এইমনিহারেরমূল্যমনেহয়তুমিবুজতেপারনি।তাছাড়াএটাতোতোমারকাছেজমারাখিনি, এটাছিলস্বীকৃতি।
অনু এই প্রথম মুখ খুলল। খুব নিচু গলায় বলল, 
-ভালবাসা কী স্বীকৃতিদেওয়ারজিনিস?তোমারকাছেকেচেয়েছেএইস্বীকৃতি?
ওকাঁপতেলাগলো।মনেহচ্ছেওরশ্বাসকষ্টহচ্ছে।হঠাৎউত্তেজিতহয়েবলতেলাগলো, 
-তুমি আমাকে ভালোবাসনি, কখনো বাসনি, তুমি যেটা করেছ তাকে বলে করুনা। তুমি চেয়েছিলে আমাকে দয়া করতে। আমি তোমার কাছে চেয়েছিলাম শুধুই ভালোবাসা। করুনা নয়, দয়া নয়। তা তুমি আমায় দিতে পারনি। 
অনুকাশতেকাশতেরক্তবমিকরেদিলো।মনু, ওরমাদৌড়েএলো।সবাইধরাধরিকরেশুইয়েদিলাম।নার্সরাওকেনিয়েব্যস্তহয়েপড়লো।
আসলেই কি আমি অনুকে দয়া করেছি? দরিদ্র পরিবারের অসাধারণ সুন্দরী এক মেয়েকে করুনাবসত মুক্তি দিতে চেয়েছি? তাতে কি কোন ভালোবাসা ছিল না? না কি প্রখর আত্মমর্যাদা সম্পন্ন অনুর মনের ভিতর দারিদ্রতার কারণে তৈরি হাওয়াএক ধরনের হীনমন্যতা। কেন অনুর কাছে মনে হয়েছিলো আমি যা করছি তা করুনা বা দয়া, ভালোবাসা না? অনু এই প্রথম আমাকে ‘তুমি’ করে বলছে।আজমনে হল, অনুর প্রেমের গভীরতায় আমি আসলে পৌঁছতেই পারিনি।অনুর ভালবাসার কাছে আমি পরাজিত। 
কতক্ষণ পার হল জানিনা। অনু চোখ খুলল।মনু এবং মনুর মা’র সামনেইমণিহারটি আমি অনুর গলায় পড়িয়ে দিয়ে দিলাম।এই মনিহার আমার দাদা, আমার বাবার ভালবাসার সাক্ষী। আজ এটা আমার নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ, নিঃস্বার্থ প্রেমের সাক্ষী হয়ে থাকল। অনু আমার জীবনের প্রথম প্রেম এবং আমারজীবনের শেষ প্রেম। 
অনু আমাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদতে লাগলো।
সেদিন শেষ বিকেলের পরন্ত বেলায় অনুমারা যায়।

Read More