(ভৌতিক গল্প) শ্মশানের কালো ছায়া

Be the first to comment!

গ্রামের নাম ছিল শালবন। গ্রামের এক প্রান্তে ছিল একটি পুরোনো শ্মশান, যেখানে বহু বছর ধরে কেউ রাতে যেত না। লোকমুখে প্রচলিত ছিল, সেখানে এক অশান্ত আত্মা ঘুরে বেড়ায়।

একদিন শহর থেকে রাহাত নামে এক কলেজ ছাত্র তার মামার বাড়িতে বেড়াতে এলো। সে ভূত-প্রেতের গল্পে বিশ্বাস করত না। গ্রামের লোকেরা যখন শ্মশানের গল্প বলল, সে হেসে উড়িয়ে দিল।

“এসব কুসংস্কার,” রাহাত বলল। “আমি আজ রাতেই শ্মশানে গিয়ে প্রমাণ করে দেব, ভূত বলে কিছু নেই।”

গ্রামের সবাই তাকে নিষেধ করল। কিন্তু সে কারও কথা শুনল না।

রাত বারোটার দিকে হাতে টর্চ নিয়ে রাহাত একাই শ্মশানের দিকে রওনা দিল। আকাশে চাঁদ ছিল না, চারদিকে ঘন অন্ধকার। দূরে শিয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছিল।

শ্মশানে পৌঁছে সে একটি পুরোনো বটগাছের নিচে দাঁড়াল। চারপাশে ভাঙা চিতা আর আগাছায় ভরা জমি। প্রথম আধঘণ্টা কিছুই ঘটল না।

হঠাৎ তার টর্চের আলো কেঁপে উঠল। বাতাসও যেন অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে গেল।

রাহাত ভাবল ব্যাটারির সমস্যা। কিন্তু ঠিক তখনই সে শুনতে পেল কারও কান্নার শব্দ।

মৃদু... তারপর ধীরে ধীরে জোরে।

সে টর্চ ঘুরিয়ে চারদিকে আলো ফেলল। কেউ নেই।

কান্নার শব্দটা যেন বটগাছের পেছন থেকে আসছে।

সাহস করে সে এগিয়ে গেল।

গাছের পেছনে গিয়ে সে যা দেখল, তাতে তার শরীর জমে গেল।

সাদা শাড়ি পরা এক বৃদ্ধা মাটিতে বসে কাঁদছে। তার লম্বা চুল মুখ ঢেকে রেখেছে।

“কে আপনি?” কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল রাহাত।

বৃদ্ধা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

মুহূর্তেই রাহাতের বুকের রক্ত যেন শুকিয়ে গেল।

বৃদ্ধার মুখে কোনো চোখ ছিল না। শুধু দুটি কালো ফাঁকা গর্ত। ঠোঁট ছিঁড়ে কান পর্যন্ত চলে গেছে।

হঠাৎ সে বিকট হাসি হাসতে শুরু করল।

রাহাত দৌড় দিতে গেল, কিন্তু তার পা যেন মাটিতে আটকে গেছে।

ঠিক তখনই চারপাশ থেকে আরও ফিসফিস শব্দ ভেসে এলো।

“থেমে যাও...”

“এখানেই থাকো...”

“আমাদের সঙ্গে থাকো...”

রাহাত দেখতে পেল অন্ধকারের ভেতর থেকে অনেকগুলো ছায়ামূর্তি বেরিয়ে আসছে। কারও মাথা নেই, কারও হাত নেই, কারও শরীর আধপোড়া।

তারা ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে ধরল।

ভয়ে রাহাত চিৎকার করে উঠল।

হঠাৎ তার টর্চ নিভে গেল।

চারদিকে শুধু অন্ধকার।

এরপর সে কিছুই মনে করতে পারেনি।

পরদিন সকালে গ্রামের কয়েকজন মানুষ শ্মশানের কাছে তাকে অচেতন অবস্থায় খুঁজে পেল। তার চুলের অনেক অংশ সাদা হয়ে গিয়েছিল, আর মুখে ছিল আতঙ্কের ছাপ।

জ্ঞান ফেরার পর সে আর কখনও সেই রাতের কথা বিস্তারিত বলেনি। শুধু একবার বলেছিল—

“ওরা এখনও সেখানে আছে... অন্ধকার নামলেই বেরিয়ে আসে...”

কয়েক মাস পর রাহাত শহরে ফিরে যায়। কিন্তু মাঝরাতে সে প্রায়ই চিৎকার করে ঘুম থেকে উঠত।

এক রাতে তার মা দরজা খুলে দেখলেন, রাহাত বিছানার কোণে বসে আছে। তার চোখ স্থির জানালার দিকে।

মা জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে?”

রাহাত ধীরে ধীরে জানালার দিকে আঙুল তুলে বলল—

“মা... ওই বৃদ্ধাটা আবার এসেছে...”

আর ঠিক তখনই জানালার বাইরে অন্ধকারে দুটি কালো, চোখহীন গর্ত যেন জ্বলজ্বল করে উঠল।

সমাপ্ত।

0 comments for "(ভৌতিক গল্প) শ্মশানের কালো ছায়া"